বৈদিক সাম্যবাদী সমাজতান্ত্রিক বিচারের আলোকে নারী ও শূদ্রের বেদপাঠ ও যজ্ঞাদি কার্যে অধিকারী/অনধিকারী প্রসঙ্গ ....এবং মীমাংসা....
★স্বধর্ম পালন, স্বধর্মের অনুশাসনে থাকা ও রক্ষা চিরকালই সহজ ব্যাপার ছিলনা, তা না'হলে ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্রকে ক্ষাত্রধর্ম রক্ষার্থে কিশোর বয়সে ভাইয়ের সঙ্গে ঋষি বিশ্বামিত্রের ডাকে সাড়া দিয়ে তাড়কা বধ করতে যেতে হ'ত না; পুত্রের ধর্ম পালন ক’রে পিতৃসত্য রক্ষার জন্য সদ্যবিবাহিতা পরমাসুন্দরী যুবতী স্ত্রীকে সঙ্গে ক’রে চৌদ্দ বছরের দুঃসহ বনবাসে যেতে হত না; পতির ধর্ম রক্ষার্থে সেই স্ত্রীকে উদ্ধার করবার জন্য শূন্য থেকে শুরু করে একখানি বিশাল সৈন্যবাহিনী খাড়া করে রাবণ নামক ব্রহ্মা ও শিবের দৈব বরে পুষ্ট এক মহাশক্তিধর রাজাকে সম্মুখসমরে হারাতে হত না; আর এত কষ্টের ফলে উদ্ধার করা প্রিয়া পত্নীকে রাজার ধর্ম রক্ষার্থে প্রজানুরঞ্জনের জন্য চিরতরে হারাতে হত না।
স্বধর্ম (প্রকৃত অর্থে, জাতিধর্ম বা কুলধর্ম) পালন এবং রক্ষা মনুষ্যজন্মের সবচাইতে কঠিন পরীক্ষা। তার চাইতে পরধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়া ঢের সহজ। কঠিন, দুর্গম পথকে এড়িয়ে পরশ্রীকাতর হয়ে মোহ, লালসা ও ইন্দ্রিয় সুখের সহজ রাস্তা ধরা মনুষ্যস্বভাবে স্বাভাবিকভাবেই আসে, তার জন্য আলাদা করে আয়াস করতে হয় না।
কঠোপনিষদ বলেছেন----
'ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া দুর্গম্ পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি।'
অর্থাৎ, মানবজীবনের চরম উদ্দেশ্য মুক্তি বা আত্মজ্ঞান লাভের পথ ক্ষুরধার, দুর্গম – এ কথাই কবিরা বলে থাকেন (এখানে ‘কবি’ অর্থে বেদমন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিগণ বুঝতে হবে)।
নিষ্কাম হয়ে, অর্থাৎ কর্মফলের চিন্তা না করে স্বধর্ম যথাযথ ভাবে পালন করলে তবেই কর্মযোগে সিদ্ধিলাভ হয়, জন্ম-মৃত্যুর যাতাকল থেকে বেরিয়ে পরমার্থ মোক্ষের প্রাপ্তি ঘটে। এ বড় সহজ পথ নয়।
এখানে শ্রীমদ্ভগবদগীতার সাবধানবাণী মনে রাখা দরকার;- 'স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ।' স্বধর্ম কষ্টকর হতে পারে, এমনকি জীবন দিয়ে স্বধর্ম রক্ষার মুল্য দিতে হতে পারে, কিন্তু পরধর্ম ভয়াবহ কারণ তাতে ভয়াবহ অধোগতি প্রাপ্ত হতে হয়, যা থেকে উদ্ধার পেতে বহু জন্মজন্মান্তর সময় লাগে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান আরও বলেছেন,,
শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ – অর্থাৎ “স্বধর্ম (নিজ জাতি/অর্থাৎ জন্ম, বংশ, কুল ইত্যাদি) বিগুণ হলেও (অপর ধর্মের তুলনায় তাতে বাঞ্ছিত গুণের অভাব থাকলেও) সু-অনুষ্ঠিত (অনায়াসে অনুষ্ঠিত, কিংবা লৌকিক দৃষ্টিতে সুন্দর অনুষ্ঠানযুক্ত) পরধর্মের চেয়ে শ্রেয় (অধিক হিতকর)।”
এই প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভগবদগীতার আরেকটি অমোঘ শ্লোক স্মরণীয়। এই শ্লোকটির দেখা মেলে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সাংখ্যযোগ নামক দ্বিতীয় অধ্যায়ে, যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবসন্ন অর্জুনকে ক্রমাগতঃ যুদ্ধের জন্য প্রবৃত্ত করছেন। নানা দিক থেকে যুক্তির অবতারণা করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর কর্তব্য যুদ্ধের জন্য প্রণোদিত করছেন, এরকমই একটি যুক্তি হিসেবে ভগবান ব’লে উঠলেন –
"স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি।
ধর্মাৎ হি যুদ্ধাৎ শ্রেয়ঃ অন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে।।"
– শ্রীমদ্ভগবদগীতা২.৩
ব্যাখ্যার এবং বোঝার সুবিধার্তে এখানে সংস্কৃত পদগুলির সন্ধি বিচ্ছেদ ক’রে শ্লোকটি উল্লেখ করলাম।
– “আর, স্বধর্ম দেখেও (স্বধর্মের কর্তব্য বুঝেও) তুমি বিকম্পিত [বিচলিত] হ’তে পার না; কারণ ধর্ম যুদ্ধের চেয়ে ক্ষত্রিয়ের আর অন্য শ্রেয় কিছু নেই।” খেয়াল করতে হবে যে গীতার শ্লোকগুলিতে ‘শ্রেয়’ শব্দটি ফিরে ফিরে আসে। ভারতবর্ষের সনাতন চিন্তা ও সংস্কৃতিতে শ্রেয় এবং প্রেয় একটি ধ্রুব দ্বন্দ্ব – যেমন ভোগ এবং ত্যাগ, অসুর এবং দেবতা, অধর্ম বনাম ধর্ম, তমসা বনাম দিব্যালোক – তেমনই প্রেয়ের সাপেক্ষে শ্রেয়। প্রেয় লাভ করা অপেক্ষাকৃত সহজতর, কারণ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি স্বাভাবিকভাবেই প্রেয়ের পানে ধায়।
শ্রেয়লাভ অনেক কঠিন; তার জন্য সাধনা করতে হয়, দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয় – আপনা থেকে এসে সে ধরা দেয় না। গীতায় বর্ণিত বিষণ্ণ ক্লীব অর্জুন কৌরবপক্ষে নিজ আত্মীয়-পরিবারবর্গকে দণ্ডায়মান দেখতে পেয়ে “ন যোৎস্য” – যুদ্ধ করব না ব’লে রথের উপর বসে পড়েছিলেন – কারণ তেমনটা করা সহজ ছিল।
তারপর প্রায় সাড়ে ছ’শো শ্লোক জুড়ে শ্রীকৃষ্ণকে উপদেশ দিতে হয়েছিল অর্জুনকে যুদ্ধে প্রণোদিত করতে, অর্জুনের নানাবিধ জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল, এবং শেষমেশ নিজের ভগবৎস্বরূপটি অব্দি প্রকাশ করতে হয়েছিল – তবেই গিয়ে অর্জুন আবার গাণ্ডীব হাতে তুলে নেন ও স্বধর্ম পালনে উদ্যত হয়।
অর্থাৎ, ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত হতে চলা পার্থকে পুনরায় নিজের স্বধর্মে প্রতিষ্ঠিত করতে পার্থ এবং পার্থসখা উভয়কেই যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। এটাই নিয়ম – স্বধর্ম পালন করবার পথ ইন্দ্রিয় পরোবশতায় ও ভাবাবেগে গা'ভাসিয়ে বিলাসের গোলাপ-বিছানো নয় –বরং কণ্টকাকীর্ণ। যেই কন্টকের ঘষায় সমস্ত পশু-পাশ ও কর্মবন্ধনের পাশ খসে গিয়ে মুক্তির মার্গ প্রশস্ত হয়, নিগূঢ় সারবৎসার তত্ব-জ্ঞান রুপী ঐশ্বর্য হৃদয়ে পদ্মের ন্যায় প্রস্ফুটিত হয়। আর স্বধর্মে শ্রদ্ধাশীল ও দৃঢ়চেতা-ব্যক্তি নরোত্তম অর্জুনের মতো যশস্বী হয়।
★আলোচনা প্রসঙ্গে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, সনাতন বৈদিকধর্ম ব্যতীত পাশ্চাত্য বা বিশ্বের যেকোন মত কেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে কোন ব্যক্তি যদি কোন বিষয়ে অনধিকৃত হয় তাহলে সে ব্যক্তি ঐ বিষয়ের ফললাভ থেকেও বঞ্চিত হয়। যা বৈষম্যের পর্যায়ে পরিগনিত হয়।
কিন্তু আমাদের সনাতন ধর্মে প্রায় প্রত্যেকটি বিষয়ের ক্ষেত্রে অধিকারী এবং অনধিকারী থাকলেও এখানে ফলচৌর্য নেই। অর্থাৎ, ফল থেকে কাউকে বঞ্চিত করা হয়নি।
অভ্রান্ত সর্বদেশকালে সর্বোৎকৃষ্ট, সর্বহিতৈষী বৈদিক সাম্যবাদী সমাজতান্ত্রিক দর্শন নিহিত হয়েছে সনাতন বৈদিক আর্য ধর্মে। এই সাম্যবাদ ভোগ বা বস্তুবাদ ও অপেক্ষিকতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বৈদিক সাম্যবাদ প্রকৃতি প্রদত্ত ভেদের অনন্যতাকে কাজে লাগিয়ে, কর্মের সুদৃঢ় বলিষ্ঠ শ্রেনীভিত্তিক বিন্যাস দ্বারা ব্যেষ্টি থেকে সমষ্টিকে পূর্ণতায় উত্তরণের নিয়োজিত ধর্মনিয়ন্ত্রিত শোষণ বিনির্মুক্ত, সর্বহিতপ্রদ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা;- যার থেকে উৎপন্ন ফলের অধিকারে কোনো ভেদ নেই। অর্থাৎ কর্মের অধিকারী ভেদ থাকলেও বৈদিক সাম্যবাদী সমাজতন্ত্র ভুক্ত সকল মানুষের ফললাভের ক্ষেত্রে বর্ণনির্বিশেষে কোনো ভেদ, বৈষম্য বা বঞ্চনা নেই। সকলেই স্বস্ব ধর্ম, পালনের দ্বারা সমান ফল লাভ করে।
তাইতো স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতাতেই উদ্ঘোষ করছেন,,------------
"স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ৷...
স্বকর্মণা তমভ্যর্চ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবঃ।। (গীতাঃ-১৮।৪৫-৪৬)― অর্থাৎ, স্ব স্ব বর্ণোচিৎ শাস্ত্র সম্মত কর্ম কর্তব্য জ্ঞানে সম্পাদনের দ্বারা, সকলেই একই পারমার্থিক ফললাভ করতে পারবে।
উদাহরণস্বরূপঃ- শিখা, যজ্ঞপবীত এবং নিত্য ত্রিসন্ধ্যাকারী পুরুষই কেবলমাত্র শালগ্রাম শিলা পূজনের অধিকারী। কিন্তু আমাদের সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো পূজনের ক্ষেত্রে অধিকারী এবং অনধিকারী থাকলেও শালগ্রাম শিলা পূজনের দরুন উৎপন্ন পূণ্য বা ফল থেকে কাউকেই বঞ্চিত করা হয়নি। কেবলমাত্র শালগ্রাম শিলা দর্শনেই যেকোন ব্যক্তিই পূজক ব্রাহ্মণের সমান ফললাভ করবেন। এক ব্যক্তির স্বধর্ম পালনে উদ্ভূত ফল সমাজের সকল স্তরে সমবণ্টনই হল বৈদিক সাম্যবাদ।


সুতরাং
আমাদের সনাতন ধর্মে বর্ণাশ্রমোচিত কর্মবিভাগ থাকা সত্ত্বেও যে ফলচৌর্য নেই অর্থাৎ, ফল থেকে কাউকে বঞ্চিত করা হয়নি এর শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত স্বয়ং বেদেই সন্নিহিত রয়েছে।যেমন, যজুর্বেদের ষড়বিংশ অধ্যায়ে যেখানে দর্শপৌর্ণমাস-পিতৃযজ্ঞ- অগ্নিহোত্র-উপস্থান ইত্যাদি অশ্বমেধসম্বন্ধী মন্ত্রসমূহের ব্যাখ্যাত করা হয়েছে, সেই অধ্যায়ের'ই দ্বিতীয় মন্ত্র বলছেন যে,,,,
"যথেমাং বাচং কল্যাণীমাবদানি জনেভ্যঃ।
ব্রহ্মরাজন্যাভ্যং শূদ্রায় চ স্বয় চারণায় চ।
প্রিয়ো দেবানাং দক্ষিণায়ৈ দাতুরিহ ভূয়াসময়ং মে
কামঃ সমৃধ্যতামূপ মদো নমতু।।"
→ "যে ভাবে আমি এই কল্যাণবাণী ঋষিদের উচ্চারণের মাধ্যমে প্রকাশ করি— ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং আপন ভক্তজনের নিমিত্ত, তাতে দক্ষিণা দানশীল আমি দেবগণের প্রিয় হবো। আমার মনোরথ অভিবৃদ্ধ হউক। এই....(অভৃষ্টের নাম) আমার প্রতি নমন হউক।
উপরোক্ত মন্ত্রের মাধ্যমে যখন পুরোহিত যজ্ঞাদি কর্ম করছেন তখন এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান যে, যজ্ঞরত অবস্থায় পুরোহিত ব্রাহ্মণের মূল উদ্দেশ্যই হলো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রাদি বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গল সাধন। যার জন্য পুরোহিত ব্রাহ্মণ কল্যাণময় বাক্যের দ্বারা বিভিন্ন দেবতাদের আহ্বান করছেন এবং এই অধ্যায়ের পরবর্তী মন্ত্রগুলোতে এর বর্ণনা রয়েছে।

স্মৃতি শাস্ত্র এবং ভাগবত পুরাণে বলা আছে,," নারী ও শূদ্রের বেদাধিকার নেই।" সেখানে 'বেদ' শব্দের মূল অভিপ্রায় কি সেটা আমাদের বোঝা উচিত।
কেননা, যে ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে নারী ও শূদ্রের বেদে অধিকার নেই; সেই ভাগবতে এও বলা হয়েছে যে, নারী ও শূদ্র তথা সমগ্র মনুষ্যজাতির কল্যাণের জন্য বেদব্যাস মহাভারত ও ব্রহ্মতত্ব-জ্ঞানপরিপুষ্ট ইতিহাস পুরানাদি রচনা করেছেন। এই মহাভারতকে কিন্তু পঞ্চম বেদ বলা হয়। রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণাদিতে নারী এবং শূদ্র থেকে শুরু করে সকলেই অধিকৃত। এমনকি ভাগবত পুরাণের প্রথম স্কন্ধের তৃতীয় শ্লোকে ভাগবত পুরাণকে বলা হয়েছে,,,"বেদরূপ কল্পবৃক্ষের সুপক্ব ফল। যে ফলে খোসা, আঁটি ইত্যাদি ত্যাজ্য অংশটুকুও নেই। এ শুধু মূর্তিমান রস।" এবং এই ভাগবত পুরাণেও নারী ও শূদ্র উভয়েই অধিকৃত।

তাহলে ভাগবত পুরাণে বর্ণিত নারী ও শূদ্রের বেদাধিকার নেই উক্ত বাক্য দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে?? কেননা, ভাগবতের এই বাক্য অনুসারে নারী ও শূদ্রের ভাগবত পুরান ও মহাভারতেও অধিকৃত থাকার কথা ছিলনা। কেননা, মহাভারত তো পঞ্চম বেদ। আর ভাগবত তো হলো একদম বেদরূপ কল্পবৃক্ষের সুপক্ব ফল। তাহলে তো ভাগবতে এখানে পরস্পরবিরোধীকথা চলে আসলো!!
এর সমাধান কি?--------- এর সমাধানের জন্য মীমাংসা'র জ্ঞান থাকা আবশ্যক। বৈদিক মীমাংসায় শাস্ত্রে একটি শব্দ আছে, যা নাম 'লক্ষণ (laksana)' অর্থাৎ, উহ্য অর্থ। উদাহরণস্বরূপ,, আমি গাছ থেকে একটি আম পাড়লাম এবং আমি একটি আম খেলাম। উভয় বাক্যের ক্ষেত্রেই আমি 'একটি আম' শব্দ ব্যবহার করেছি। কিন্তু আমি যখন বলেছি, গাছ থেকে একটি আম পাড়লাম তখন আমি সম্পূর্ণ(খোসা, আঁটিসহ) আমটিই পাড়লাম। কিন্তু যখন আমি বলছি, আমি একটি আম খেলাম তখন কিন্তু আমি সম্পূর্ণ আমটি যেভাবে গাছ থেকে পেড়ে এনেছি সেভাবে খেয়ে ফেলিনি। আমের খোসা, আঁটি ফেলে দিয়েছি। কেবলমাত্র যেটুকো খাওয়ার যোগ্য সেটুকুই খেয়েছি। উভয় বাক্যে 'একটি আম' শব্দ ব্যবহার করলেও আমি যখন বলেছি একটি আম খেয়েছি তখন আপনি ঠিকই বুঝে নিয়েছেন যে, আমি খোসা এবং আঁটি ফেলে দিয়ে কেবলমাত্র খাওয়ার অংশটুকুই খেয়েছি। এবং যখন আমি বলেছি একটি আম পেড়েছি তখন খোসা, আঁটি সমেত গোটা আমটিই পেড়ে এনেছি। একেই বলে lakshana অর্থাৎ, শব্দের উহ্য অর্থ।
ভাগবতে নারী ও শূদ্রের বেদাধিকার নেই বাক্যে 'বেদ' শব্দ দ্বারা মূলতোঃ বেদোক্ত কর্মকান্ডের অংশকে বোঝানো হয়েছে। কেননা বেদোক্ত কর্মকান্ড উপন্যাস নয় যে আপনি পড়ে পড়ে মজা লুটবেন। এগুলো প্রায়োগিক বিষয়। আর জ্ঞান কান্ড অর্থাৎ, শুধুমাত্র উপনিষদ পড়েই যদি ব্রহ্মজ্ঞানের প্রাপ্তি ঘটতো তাহলে ত্রেতা এবং দ্বাপর যুগে সকল ব্রাহ্মণই ব্রহ্মজ্ঞানী হয়ে যেত।→ এবার আরও শুনুন, বেদ শব্দের একটি অর্থ হলো জ্ঞান। সেই জ্ঞান, যার দ্বারা ভোগ-রাগ সম্বলিত ব্যবহারিক ও পারমার্থিক উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের উৎকর্ষ সাধন হন। এই জ্ঞান থেকে কাউকেই বঞ্চিত করা হয়নি। আর সার্বিক ভাবে বত্রিশ বিদ্যা ও চৌষট্টি কলাদি সকলি ঈশ্বরের সংকল্পে ঋষি প্রজ্ঞার দ্বারা বেদবাণী মন্থনে উদ্ভূত বৃহত্তর বৈদিক কর্মকান্ডের অন্তর্গত এবং বর্ণভিত্তিক প্রতিটি শ্রেণীর কর্ম এই সামগ্রিক বৈদিক বিদ্যারই অন্তর্ভুক্ত। আর শ্রেনীভিত্তিক পরম্পরাকে শ্রদ্ধার সাথে অনুপালনের দ্বারা ভগবৎ প্রাপ্তি প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্যই নিশ্চিত হয়। কিন্তু তা কখনোই সনাতন বৈদিক ধর্মশাস্ত্র ও পরম্পরা বিহীত কর্মের মর্যাদার সীমাকে উলংঘন করে নয়। বরং বৈদিক ধর্মশাস্ত্রে নিহিত পরম্পরা বিহীত কর্মের মর্যাদা উলঘন করলে বা স্বধর্মে নিহিত কর্মকর্তব্যের প্রতি বিমুখ হলে নিসর্গসিদ্ধ ভাবে জন্মজন্মান্তর ধরে কর্ম ও ভোগের বন্ধনেই আবদ্ধ'ই থাকতে হয়।
তাই এই কল্যাণকারী জ্ঞানই সার্বিক হিতে সনাতন সমাজভুক্ত প্রতিটি ব্যক্তিকে পূর্ণতায় অধিষ্ঠিত করবার নিমিত্তে বৈদিক সংবিধান রূপে স্মৃতি শাস্ত্র হিসেবে মনু-আদি ঋষির দ্বারা বৈদিক সমাজতন্ত্রে নিযুক্ত।

ভগবান ঋষি মনু বলছেন,,,,,
''যত্রনার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতা,
যত্রৈতাস্তু ন পুজ্যন্তে সর্বশাস্ত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ।।''
–অর্থাৎ যেই স্থানে বা গৃহে নারী পূজিত হয় অর্থাৎ বিশেষ ভাবে সম্মানিত হয়, সেই গৃহে সকল দৈবকৃপা বর্ষিত হয়। আর যেখানে এরূপ হয়না সেই স্থানে সর্ব-শাস্ত্র সর্ব বৈদিক ক্রিয়াদিও নিষ্ফলা হয়।
অথচ বৈদিক শাস্ত্রে পুরুষের প্রতি নারীর সমতুল্য এইরূপ মর্যাদা বর্ণিত হয় নি। বরং এটাই স্পষ্ট হয় যে, ধর্মপরায়না সনাতনী নারী আধ্যাত্মিক গুনাবলীতে পুরুষদের থেকেও উচ্চস্থানে অবস্থান করে। কারণ প্রতিটি নারী বিশ্বযোনী ঈশ্বরের ভগবতী স্বরূপের প্রত্যক্ষ অংশই। তার অবদানেই সৃষ্টি' স্নেহ-মমতার ছত্রছায়ায় লালিত পালিত হয়, এগিয়ে চলে শিক্ষা, পরম্পরা; তার সাথে তাঁর মাতৃত্বের হাত ধরে এগিয়ে চলে সভ্যতার কৃষ্টি, সংস্কৃতি , ইতিহাস, এমিনকি যুগচক্রের অবতার ক্রমও। তাছাড়াও সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয়, একজন নারী তার সমগ্র জীবনই ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন। প্রত্যেক মাসে রজঃস্বলা অবস্থায় একজন নারী যে পরিমাণ যন্ত্রণা অনুভব করে তা কখনো ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। আর প্রসবকালীন যন্ত্রণা'তো আমাদের কল্পনারও ঊর্ধ্বে। অথচ তার এই যন্ত্রনা ভোগকে অবলীলায় বরণ করার মাধ্যমেই সমগ্র সভ্যতার অস্তিত্ব টিকে রয়েছে। আর তাঁর অবদানেই ধর্ম-কর্ম-আদর্শ-জ্ঞান সকল'ই বাহিত হতে পেরেছে।
সর্বেশ্বর ভগবান পক্ষপাতযুক্ত নন, তাই তাঁর জ্যোতি প্রকাশ স্বরূপ মহর্ষি , মহামুনিগণও পক্ষপাত দুষ্ট নন। সৃষ্টির নিমিত্তে'ই নারীর সকল ভোগ-যন্ত্রনা; আমৃত্যু পরিবার কল্যানে নিয়োজিত স্নেহ মমতার একমাত্র আঁধার স্বরূপা তিনি 'মা'; যম, নিয়ম, প্রত্যাহারাদি যৌগিক অলংকারে তাই সে 'নিসর্গসিদ্ধ'। আবার সেই মায়ের হাতে মার খেয়ে বালক রুপী ভগবান মহিমান্বিত হন। তাই এই নারীশক্তির বা মাতৃশক্তির নৈসর্গিক গুণাবলীর মধ্যেই সেই বল-বেগ নিয়োজিত যে, তাকে ফললাভ বা পারমার্থিক প্রাপ্তির জন্য আলাদাভাবে কোনো বৈদিক মন্ত্র পাঠ , যাজ্ঞিক ক্রিয়াদির অবলম্বন নিতে হয় না । তাদের বেদোক্ত যাগ-যজ্ঞাদি করবার কোন আবশ্যকতাই পরে না। কেবলমাত্র তাঁর সংসারে তাঁর সহজাত গুণদ্বারা সেবার মাধ্যমে অর্থাৎ মাতৃত্ব, স্নেহ, মমতা, প্রেম নিষ্ঠা, সত্যপরায়নতার দ্বারা সংসার তথা সৃষ্টিকে লালন, সঞ্চালনের দ্বারাই সে সর্বোচ্চ পারমার্থিক ভূমিতে আরোহণ করেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রামায়ণে বর্ণিত দেবতা, যক্ষ্ম গন্ধর্ব, মুনি-ঋষিগণ এমনকি ভগবান রামচন্দ্রের দ্বারা পূজিত 'মহাসতী দেবী অনুসুয়া'। এই রূপ সনাতন বৈদিক ধর্ম প্রতিপালনকারিণী নারী জাগতিক বা আধ্যাত্মিক ফললাভের ইচ্ছায় শুধুমাত্র ভগবানের নাম স্মরণ করলেই অভিষ্ঠ ফল লাভ করেন। আর তা প্রদানে ভগবানও নিঃসংকোচ থাকেন কারণ সনাতন বৈদিক আদর্শের মাতৃচরিত্র নিজেকে স্নেহ-মমতায় উৎসর্গ করে সন্তান ও সংসার স্বার্থে। 

★★★ এবার আসি শূদ্রদের বেদমন্ত্র পাঠ এবং বেদ মন্ত্র শ্রবণে কানে সীসা ঢালা সম্পর্কে--------------
প্রথমেই আমাদের জানা উচিত শূদ্রদের কর্ম কি ছিল। কেননা, আমাদের সমাজের অধিকাংশের
ধারণা শূদ্র মানে শুধুমাত্র মুচি-মেথর, এবং বৈদিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে পাশ্চাত্য-শিক্ষা-সংস্কৃতিতে জর্জরিত আজকের হিন্দুজাতি শাস্ত্র নির্ধারিত জাতিগত জীবিকার উচ্চ-নীচ বিচার করি। যদ্যপি সনাতন বৈদিক বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় কোন কর্মকেই ছোট করে দেখা হতোনা। আমাদের সনাতন বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় প্রত্যেকের কর্মকেই যথোপযুক্ত সম্মান এবং পারিশ্রমিক দেওয়া হতো, যাতে প্রতিটি শ্রেণীই তাদের স্ব-স্ব বর্ন ভিত্তিক জীবিকায় উৎসাহিত হওয়ার মাধ্যমে বংশপরম্পরায় বাহিত ও নিয়োজিত কর্মের গুণ শ্রেনীভিত্তিক শিক্ষার সংস্কারের মাধ্যমে ব্যক্তি তার জীবনে উৎকর্ষতার চরম সীমা অতিক্রমন করতে পারে। এই প্রকার কর্মবন্টণ, শিক্ষানীতি, শ্রেয়স্কর ফলসমূহের সমবন্টণ, শ্রমের যোগ্য মূল্য ও মর্যাদা নিহিত থাকায়; একমাত্র এই বৈদিক সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থাই ভারতীয় সুপ্রাচীন সনাতন সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিশ্বগুরু স্বরূপ নির্বিকল্প স্থান এনে দিয়েছে।

শূদ্রদের কর্ম সম্পর্কে শ্রৌত সূত্রের ভাষ্যে আচার্য কর্ক বলেছেন,,,,,,,,,,,
"শিল্পউপজীবনম্ প্রতিসিদ্ধং ত্রৈবর্ণিকানম্"
শিল্প অর্থাৎ, Engineering এর মাধ্যমে উপজীবন অর্থাৎ, জীবন নির্বাহ করবে। এর তাৎপর্য হলো শূদ্রদের প্রধান বৃত্তি বা পেশা হলো কলা, শিল্প, নির্মাণাদি অর্থাৎ আজকের ভাষায় Engineering Technology, Artistry, Designer. এছাড়াও বিভিন্ন service oriented field এও শূদ্রের অগ্রাধিকার সিদ্ধ।
কৈলাশ মন্দির থেকে শুরু করে ভারতবর্ষে যতসব অভূতপূর্ব মন্দির আছে সব শূদ্ররাই তৈরী করেছিল। আধুনিক সমাজে সকলের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত পেশা হলো Engineering.কেবলমাত্র Engineering না, অভিনেতা, সঙ্গীতশিল্প, সহ সকল শিল্পেই শূদ্রের অধিকার প্রশস্ত। ৬৪ কলা-বিদ্যার জ্ঞান শূদ্রদের জন্য সদা উন্মুক্ত, যার দ্বারা জীবিকা অবলম্বনে তারা আর্থিক সম্পদ ও বিষয়-সম্পত্তিতে তৎকালীন অতিনূন্য অনুদান আশ্রয়ী ব্রাহ্মণের অপেক্ষা অধিক ভোগ ও স্বাচ্ছন্দেই জীবন অতিবাহিত করতো।
★পরিশেষে আসছি বেদমন্ত্র শ্রবণে শূদ্রদের কানে সীসা ঢেলে দেওয়া হতো এ প্রসঙ্গে-------------
দেখুন, সোম যজ্ঞ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রৌত যজ্ঞ করবার জন্য সোমলতা মূলতো শূদ্রদের থেকে ক্রয় করা হতো। তখন সোমলতা কেনার প্রক্রিয়া হিসেবে তাদের কানে বেদমন্ত্র পড়া হতো।
তাছাড়াও মন্দির বানাতো কারা?— শূদ্ররা। কেননা, ইঞ্জিনিয়ারতো তারাই ছিল। মন্দির নির্মাণের সময়ও তাদের কানে বেদমন্ত্র পড়া হতো।
→তাহলে স্মৃতি শাস্ত্রে কেন বেদমন্ত্র শ্রবণে শূদ্রদের কানে সীসা ঢালার প্রসঙ্গ এসেছে ?
আসলে বিষয়টি এইজন্যই বলা হয়েছে যে, যদি কোন শূদ্র নিজ স্বধর্মের কর্তব্য কর্ম ছেড়ে দিয়ে ভাবনার প্রগল্ভতায় অদূরদর্শীতা ও মোহের বশবর্তী হয়ে পরোধর্মের কর্মকান্ড করতে উদ্যত হয় তখন তার ঐ আচরণের জন্য তার নিজেরই জাগতিক ও পারমার্থিক অপকর্ষ হয়। এই প্রকার ইন্দ্রিয়পরোবশ অদূরদর্শী বিক্ষিপ্ত আচরণের উপরে যদি সাংবিধানিক প্রতিষেধ বলবৎ না করা হয় তাহলে এই ধরনের বিচ্যুতি আরো ঘটতে থাকবে। যার ফলে সার্বিক (জাগতিক ও পারমার্থিক) কল্যাণমুখী সুস্থ সমাজব্যবস্থার পতন ঘটে, অপকর্ষই সাধিত হয়। তাই সার্বিক হিতের জন্যই স্মৃতি শাস্ত্রে সাবধান বাণীসূচক এইরূপ বচন উদ্ধৃত হয়েছিল।


তারপরও একদল লোক এসে বলবে,,,,,,,,,,, আমরা এতকিছু বুঝিনা। ব্রাহ্মণরা লুটে-পুটে সব শেষ করেছে, সবার সব কিছুতে অধিকার চাই। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি,,,, বর্তমানে অবৈদিক পাশ্চাত্য আদর্শের পার্লামেন্টারিয়ান ডেমিকরেসির যুগে, কলির কৃপাগ বেশিরভাগ মানুষ ধর্মানুশাসন বর্জন করে প্রোগ্রেসিভের খাতায় নাম লিখিয়েছে, তাছাড়াও বাজারে সবরকমের শাস্ত্র কিনতে পাওয়া যায়।
কিনে পড়ুননা। কে আপনাকে মারতে যাবে বা বলতে যাবে??
কিন্তু তাসত্ত্বেও আপনারা পড়বেন না। বোঝালেও বুঝতে চাইবেন না।
উপরন্তু ফেসবুকে এসে বড় বড় ঐক্যের বাতেলা ঝাড়বেন । যদিও'বা এক-দুজন পড়েনও তাও রেফারেন্স সংগ্রহ করে বিতন্ডা করবার উদ্দেশ্যে।
সংস্কারের নামে বৈদিক-সমাজতান্ত্রিক বিজ্ঞান না বুঝেই তা বিসর্জন দেওয়ার ডায়ালগ আওরে , আর নিরর্থক ভিকটিম-প্লে করে আপনারা হিন্দুর কি বিরাট উদ্ধার করবেন তা আপনারাই জানেন।
লেখকঃ- অদ্রিব দেবনাথ
★ড. সায়ন দেবশর্মা ( পুরীপীঠাধীশ্বর জগৎগুরু শঙ্করাচার্য স্বামী নিশ্চলানন্দ সরস্বতী'জীর কৃপাধন্য শিষ্য )
নমামি শঙ্কর 
নমামি দূর্গে 
★©©©©©©©©©©©©©©©©©©©©©★
―◆অনুলিপির ক্ষেত্রে পোস্টে ক্রেডিট ও ব্যবহৃত চিত্রের ব্যবহার বাঞ্চনীয়◆―